ইসলামে পশু অধিকার

Salih Mirza Aka

ইসলাম মানবজাতিকে পৃথিবীর ‘খলিফা’ (রক্ষক ও তত্ত্বাবধায়ক) হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেও, এটি মানবজাতির উপর মহাবিশ্বের সকল অন্যান্য জীবিত প্রাণীর প্রতি গভীর দায়িত্ব আরোপ করে। যদিও আধুনিক বিশ্বে পশু অধিকার ধারণা তুলনামূলকভাবে নতুন, ইসলামী ঐতিহ্য ১৪ শতাব্দী ধরে পশুদের শুধুমাত্র ‘সম্পদ’ হিসেবে নয়, বরং সম্মানের যোগ্য এবং অধিকারসম্পন্ন জীব হিসেবে বিবেচনা করে এসেছে।

ইসলামী চিন্তাধারায়, পশুগুলো আত্মাহীন সত্তা নয় যেগুলো শুধুমাত্র মানুষের ব্যবহারের জন্যই বিদ্যমান। বরং, মানুষের মতোই তাদেরও নিজস্ব সামাজিক ব্যবস্থা, ভাষা এবং সম্প্রদায়গত কাঠামো রয়েছে। পবিত্র কুরআন এই সত্যকে অত্যন্ত সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপন করে।

‘পৃথিবীতে এমন কোনো প্রাণী নেই, আর এমন কোনো পাখি নেই যা দুই পাখা নিয়ে উড়ে, তবে তারা তোমাদের মতোই সম্প্রদায়। আমি কিতাবে কিছুই বাদ দিইনি। তারপর তারা তাদের প্রতিপালকের কাছে সমবেত হবে।’ (আল-আন’আম, ৩৮)

এই আয়াত প্রমাণ করে যে পরিবেশগত ভারসাম্য এবং পশু অধিকার ঐশ্বরিক সুরক্ষার আওতায় রয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, একটি প্রাণীর অধিকার লঙ্ঘন করা মানেই আল্লাহ কর্তৃক সৃষ্ট একটি ‘সম্প্রদায়ের’ অধিকার লঙ্ঘন করা।

ইসলামের মতে, মহাবিশ্বের প্রতিটি সত্তারই সৃষ্টিকর্তার সাথে একটি অনন্য সম্পর্ক রয়েছে। পশু-পাখিরাও এই আধ্যাত্মিক বাস্তুতন্ত্রের অংশ এবং তাদের নিজস্ব ফিতরাত (স্বাভাবিক স্বভাব) অনুযায়ী আল্লাহকে মহিমান্বিত করে।

‘তুমি কি দেখো না যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু আছে এবং সারিবদ্ধভাবে উড়ন্ত পাখির দল—সবাই আল্লাহকে মহিমান্বিত করে? প্রত্যেকেই তার প্রার্থনা ও মহিমা জানে। আল্লাহ তাদের কর্ম সম্পর্কে সম্পূর্ণ অবগত।’ (আন-নূর, ৪১)

এই দৃষ্টিভঙ্গি মুসলিমদের প্রকৃতি ও প্রাণীর প্রতি গভীর বিনম্রতা অবলম্বন করার আহ্বান জানায়। আকাশে উড়ন্ত পাখি হোক বা মাটিতে চলাচর করা পিঁপড়ে, প্রতিটিই ঐশ্বরিক স্মরণের অংশ এবং শুধুমাত্র সেই কারণেই সম্মানের যোগ্য।

যদিও কুরআন প্রাণীজগৎ মানুষের জন্য যে উপকার নিয়ে আসে তা তুলে ধরে, এটি শিক্ষা দেয় যে এই সম্পর্ক শোষণের ভিত্তিতে নয়, বরং কৃতজ্ঞতা ও করুণার ভিত্তিতে হওয়া উচিত।

“তিনি পশুদেরও সৃষ্টি করেছেন। তাদের মধ্যে রয়েছে উষ্ণতা এবং তোমাদের জন্য অনেক উপকার। তোমরা তাদের মধ্যে কিছু খাও। সন্ধ্যায় তাদের ঘরে নিয়ে আসা এবং সকালে ছেড়ে দেওয়ার মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সৌন্দর্য ও আনন্দ।” (আন-নাহল, ৫–৬)

এই আয়াতগুলোতে ‘সৌন্দর্য ও আনন্দ’ শব্দগুচ্ছটি বিশেষভাবে নজর কাড়ে। পশুগুলো কেবল তাদের মাংস, দুধ বা শক্তির জন্য ব্যবহারের উপকরণ নয়; তারা নান্দনিক সত্তা এবং এই পৃথিবীতে মানবতার সঙ্গী। এই ‘বিশ্বাসের’ অনুভূতি আমাদের নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর অনুশীলনে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল। এক তৃষ্ণার্ত কুকুরকে পানি দেওয়ার কারণে যার পাপ ক্ষমা করা হয়েছে এমন ব্যক্তির জন্য প্রদত্ত সুসংবাদ, অথবা বিনোদনের জন্য (খেলাধুলার উদ্দেশ্যে) প্রাণী শিকার নিষিদ্ধকরণ—এই করুণার সভ্যতার ভিত্তিস্তম্ভ।

ইসলাম ন্যায়ের ধারণাটিকে শুধুমাত্র মানবিক সম্পর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে সকল জীবন্ত সত্তার মধ্যে প্রসারিত করেছে। পশুদের কষ্ট দেওয়া, তাদের সামর্থ্যের বাইরে কাজ করানো, মুখে আঘাত করা বা শিকার হিসেবে ব্যবহার করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। পশুদের সম্পর্কে ইসলামের বার্তা স্পষ্ট: পৃথিবীতে দয়া দেখাও, যাতে স্বর্গেও তোমার প্রতি দয়া দেখানো হয়। এই বিশ্বাসের ব্যবস্থায়, পিঁপড়ের বাসা রক্ষা করা বা পাখির প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন করা শুধুমাত্র দয়াশীলতার কাজ নয়, বরং সৃষ্টিকর্তার সন্তুষ্টি অর্জনের উপায়।

Related Posts

Are you sure want to unlock this post?
Unlock left : 0
Are you sure want to cancel subscription?